ads

জেফরি এপস্টাইন কেলেঙ্কারি: বিল গেটসের ‘পরিকল্পিত’ ইমেজ ধসের নেপথ্যে যা জানা গেল!


বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তি ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বিল গেটস দীর্ঘদিন ধরে জনহিতৈষী কর্মকাণ্ড, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং শিক্ষা খাতে অবদানের জন্য পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় গেটসের বহু বছরের গড়ে তোলা ইতিবাচক ভাবমূর্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

শনিবার প্রকাশিত দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিস্তৃত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিল গেটসকে জনসমক্ষে উপস্থাপনের জন্য তার প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিত কৌশল অনুসরণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গেটসের পোশাক, চেহারা, গণমাধ্যমে উপস্থিতি এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমও সুচিন্তিতভাবে পরিচালনা করা হতো, যাতে তাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ-সরল ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে তুলে ধরা যায়।

জার্নালের প্রতিবেদনে গেটসের বর্তমান ও সাবেক কর্মীদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তার পোশাক নির্বাচনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি ম্যানিকুইন ব্যবহার করা হতো। সাদামাটা ভি-নেক সোয়েটার, বোতাম লাগানো শার্ট এবং তার পরিচিত চশমা ছিল এই ইমেজ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লক্ষ্য ছিল—১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদের মালিক বিল গেটসকে যেন সাধারণ মানুষ একজন সহজলভ্য ও মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতে পারে।

শুধু পোশাক নয়, তার অনলাইন উপস্থিতিও ছিল সুপরিকল্পিত। ‘গেটস নোটস’ ব্লগের জনপ্রিয়তা বাড়াতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী বৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ভাইরাল কনটেন্ট তৈরির উদ্যোগও ছিল। এক পর্যায়ে বিল গেটস ও বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেটকে নিয়ে তৈরি একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনায় আসে, যেখানে তাদের একটি ফাস্টফুড আউটলেটে আইসক্রিম পরিবেশন করতে দেখা যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া নেটফ্লিক্স তথ্যচিত্র ‘হোয়াটস নেক্সট? দ্য ফিউচার উইথ বিল গেটস’-এর ক্ষেত্রেও ইমেজ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে আসে। তথ্যচিত্রটির প্রাথমিক সংস্করণ দেখার পর গেটস ভেঞ্চারসের প্রধান নির্বাহী প্রযোজকদের কাছে নয় পৃষ্ঠার একটি মন্তব্যপত্র পাঠান। সেখানে গেটসের মুখের অভিব্যক্তি, দৃশ্য উপস্থাপন এবং অন্যান্য ব্যক্তিত্বের তুলনায় তাকে কীভাবে দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে বিল গেটসের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। গেটস ফাউন্ডেশন ও গেটস ভেঞ্চারসের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা গেছে, এপস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং পরবর্তীতে প্রকাশিত বিভিন্ন অভিযোগই বর্তমানে গেটসকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক আলোচনার কারণ।

২০২১ সালে বিল ও মেলিন্ডা গেটসের বিবাহবিচ্ছেদের পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে। মেলিন্ডা গেটস প্রকাশ্যে বলেছিলেন, এপস্টাইন সংক্রান্ত অভিযোগ এবং তথ্য তাকে গভীরভাবে হতাশ ও ব্যথিত করেছে। পরবর্তীতে এক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বিল গেটসও স্বীকার করেন যে, অতীতে কিছু ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল এবং জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে যোগাযোগ গেটস ফাউন্ডেশনের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলনে বিল গেটসের নির্ধারিত মূল বক্তব্য শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টাইন-সংক্রান্ত নতুন বিতর্ক সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান ইউগভের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা বর্তমানে বিল গেটস সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। এর ফলে তার জনসম্পৃক্ততা কমিয়ে আনার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, তিনি তার বাসভবনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সিইও সম্মেলনের ডিনার অনুষ্ঠানও বাতিল করেছেন। এমনকি দীর্ঘদিনের বন্ধু ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠকেও অংশ নেননি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগামী ১০ জুন মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ওভারসাইট কমিটির সামনে বন্ধ দরজার বৈঠকে সাক্ষ্য দিতে পারেন বিল গেটস। সেখানে জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে তার যোগাযোগ, বৈঠক এবং সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

তবে বিল গেটসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিনি অতীতের ভুলের জন্য ইতোমধ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং তদন্তে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তার মুখপাত্র জানিয়েছেন, গেটস স্বেচ্ছায় হাউস ওভারসাইট কমিটির সঙ্গে কথা বলবেন এবং এপস্টাইন-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন, যাতে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার পেতে পারেন।

প্রযুক্তি জগতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিল গেটসের ক্যারিয়ার ও জনহিতৈষী কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হলেও, এপস্টাইন বিতর্ক তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত ভাবমূর্তির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে সবার নজর রয়েছে আসন্ন কংগ্রেসীয় শুনানি এবং নতুন তথ্য প্রকাশের দিকে।

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ