গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ। পারিবারিক কলহের জেরে পরিকল্পিতভাবে স্ত্রী, তিন কন্যা সন্তান ও শ্যালককে হত্যার পর প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লা পদ্মা সেতু এলাকা থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছে গাজীপুর জেলা পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়।
পুলিশ জানায়, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর এলাকার মৃত আতিকার রহমান মোল্লার ছেলে ফোরকান মোল্লা (৪০) প্রায় ১৬ বছর আগে শারমিন বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে তিন কন্যা সন্তান ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি ও পারিবারিক কলহ চলছিল।
প্রায় ছয় মাস আগে ফোরকান স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউজকোনা পূর্বপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। তিনি পেশায় প্রাইভেটকার চালক ছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, গত ৮ মে রাতে ফোরকান তার শ্যালক রাসেল মোল্লাকে গাড়ি কেনার কথা বলে গোপালগঞ্জ থেকে কাপাসিয়ায় নিয়ে আসেন। এরপর গভীর রাতে পরিবারের সদস্যদের খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ বা অচেতনকারী কোনো পদার্থ মিশিয়ে খাওয়ানো হয় বলে ধারণা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
সবাই অচেতন হয়ে পড়ার পর ধারালো চাপাতি দিয়ে স্ত্রী শারমিন বেগম, তিন কন্যা সন্তান এবং শ্যালক রাসেল মোল্লাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন ফোরকানের স্ত্রী শারমিন বেগম, তাদের তিন মেয়ে এবং শ্যালক রাসেল মোল্লা। হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার পর নিহত শারমিনের বাবা শাহাবুদ্দিন মোল্লা কাপাসিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপরই গাজীপুর জেলা পুলিশ, পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং কাপাসিয়া থানা পুলিশের একাধিক টিম তদন্তে নামে।
পুলিশ জানায়, আধুনিক প্রযুক্তি, মোবাইল ট্র্যাকিং ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে দেখা যায়, হত্যার পর ফোরকান ঢাকার দিকে পালিয়ে যান এবং পরে পদ্মা সেতু এলাকায় অবস্থান নেন।
১১ মে সকালে পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের পাশে ফোরকানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। এছাড়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি কিছু সময় সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে থাকার পর নদীতে ঝাঁপ দেন। পুলিশের ধারণা, ওই ব্যক্তি ফোরকান মোল্লা।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার Sharif Uddin Ahmed বলেন, “ঘটনার পরপরই পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জেরে ফোরকান মোল্লা পরিকল্পিতভাবে স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালককে হত্যা করেছেন। হত্যার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং পরে পদ্মা সেতু এলাকা থেকে আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে নদীতে ঝাঁপ দেন বলে আমরা জানতে পেরেছি।”
তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযুক্তের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়াও চলছে।
এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেকেই এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ পারিবারিক হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করছেন।
নিহতদের স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণগুলো গভীরভাবে অনুসন্ধান করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
0 মন্তব্যসমূহ