ত্বকের যত্ন, ওজন নিয়ন্ত্রণ কিংবা হরমোনজনিত পরিবর্তন— নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত এসব বিষয়ই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু শরীরের ভেতরে নীরবে চলতে থাকা আরেকটি বড় পরিবর্তনের কথা অনেকেই বুঝতে পারেন না। সেটি হলো হাড়ের ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমে যাওয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩৫ বছর পার হওয়ার পর থেকেই নারীদের শরীরে হাড় ক্ষয়ের প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে শুরু হয়। শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ না থাকায় বেশিরভাগ নারী বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। অথচ সময়মতো সচেতন না হলে ভবিষ্যতে অস্টিওপোরোসিস, হাড় ভেঙে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কিংবা চলাফেরায় জটিলতার মতো বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
৩৫-এর পর শরীরে শুরু হয় নীরব পরিবর্তন
চিকিৎসকদের ভাষায়, নারীদের হাড়ের সর্বোচ্চ শক্তি বা ‘পিক বোন মাস’ সাধারণত ২০-এর শেষ কিংবা ৩০-এর শুরুর দিকে তৈরি হয়। এরপর ধীরে ধীরে শরীরে নতুন হাড় তৈরি হওয়ার তুলনায় হাড় ক্ষয়ের গতি বেড়ে যায়।
নয়াদিল্লির মণিপাল হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. ললিত নেমিচাঁদ বাফনার মতে, অধিকাংশ নারী ৩০-এর দশকে হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে খুব একটা ভাবেন না। অথচ এই সময় থেকেই শরীরে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয়। ৩৫ বছর পার হওয়ার পর হাড় ক্ষয়ের গতি বাড়তে থাকে এবং ধীরে ধীরে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের শুরুতে সাধারণত কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের হাড় ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
হাড় দুর্বল হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ক্ষয়ের অন্যতম জটিল দিক হলো এটি প্রথম দিকে প্রায় নীরব থাকে। তবে কিছু ছোট লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে।
যেমন—
- উচ্চতা সামান্য কমে যাওয়া
- মাঝেমধ্যে কোমর বা পিঠে ব্যথা
- সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙে যাওয়া
- হাঁটাচলায় অস্বস্তি
- শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া
অনেক ক্ষেত্রে হাড় ভেঙে যাওয়ার পরই রোগটি ধরা পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ বছরের বেশি বয়সী বহু নারী অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হলেও তা জানতে পারেন অনেক দেরিতে।
অস্টিওপোরোসিস আসলে কী?
অনেকে মনে করেন অস্টিওপোরোসিস মানেই শুধু হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে এটি হাড়ের ভেতরের গঠনগত পরিবর্তন।
স্বাভাবিক হাড় অনেকটা ঘন স্পঞ্জের মতো। কিন্তু অস্টিওপোরোসিসে সেই স্পঞ্জের ভেতরে বড় বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। ফলে হাড় পাতলা, ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে অল্প আঘাতেও হাড় ভেঙে যেতে পারে।
নারীদের হাড় দ্রুত দুর্বল হওয়ার কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সের পাশাপাশি আরও কিছু কারণ নারীদের হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
১. হরমোনের পরিবর্তন
ইস্ট্রোজেন হরমোন নারীদের হাড় সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ করে মেনোপজের আগে-পরে এই হরমোনের মাত্রা কমতে থাকে। ফলে হাড় দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে।
২. ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি
অনেক নারী নিয়মিত ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খান না। পাশাপাশি পর্যাপ্ত রোদে না থাকার কারণে শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিও দেখা দেয়। এতে হাড়ের ঘনত্ব কমে যায়।
৩. শারীরিক পরিশ্রম কম হওয়া
দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, হাঁটাচলা কম করা কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম না করার ফলে হাড়ের শক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাঁটা ও হালকা ব্যায়াম হাড় মজবুত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪. গর্ভধারণ ও বুকের দুধ খাওয়ানো
গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে শরীর থেকে প্রচুর ক্যালসিয়াম ব্যবহার হয়। সঠিক পুষ্টি না পেলে এটি হাড়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেক্সা স্ক্যান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করার জন্য ‘ডেক্সা স্ক্যান’ করা হয়। এটি খুব সহজ ও ব্যথাহীন একটি পরীক্ষা। কিন্তু বেশিরভাগ নারী প্রয়োজনের আগেই এই পরীক্ষা করান না।
চিকিৎসকদের মতে, ৩৫ বছরের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করা জরুরি, বিশেষ করে যাদের পরিবারে অস্টিওপোরোসিসের ইতিহাস আছে।
হাড় শক্ত রাখতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স বাড়লেও সঠিক জীবনযাপনের মাধ্যমে হাড় ক্ষয়ের গতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এর জন্য প্রয়োজন—
- নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম
- ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া
- প্রতিদিন কিছু সময় রোদে থাকা
- ভিটামিন ডি গ্রহণ
- পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- ধূমপান ও কোমল পানীয় কম খাওয়া
সচেতনতা জরুরি
৩৫ বছরের পর হাড় ক্ষয় হঠাৎ করে শুরু হয় না; এটি ধীরে ধীরে শরীরে প্রভাব ফেলে। আর ঠিক এই কারণেই বিষয়টি অনেক সময় গুরুত্ব পায় না।
ত্বকের যত্ন বা ওজন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা এখনো অনেক কম। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যার প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নারীদের উচিত ৩৫ বছর পার হওয়ার পর থেকেই হাড়ের স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
0 মন্তব্যসমূহ